বায়ুপ্রবাহ ও তার শ্রেণীবিভাগ
ভূমিকা
পৃথিবীতে বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে বায়ু যখন উচ্চচাপযুক্ত অঞ্চল থেকে নিম্নচাপযুক্ত অঞ্চলের দিকে চলে, তখন তাকে বায়ুপ্রবাহ বা বাতাসের প্রবাহ বলা হয়। বায়ুপ্রবাহের গতি মাপার জন্য অ্যানিমোমিটার ব্যবহার করা হয় এবং বায়ুর গতি নট (knot) এককে প্রকাশ করা হয়।
বায়ুপ্রবাহকে দুটি দিক থেকে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়—উৎপত্তি অনুযায়ী এবং প্রকৃতি অনুযায়ী।
বায়ুপ্রবাহের প্রধান শ্রেণীবিভাগ
উৎপত্তি অনুযায়ী শ্রেণীবিভাগ
সারা পৃথিবীতে বায়ুপ্রবাহকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
প্রাথমিক বায়ুপ্রবাহ – যেমন: আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু, মেরু বায়ু
গৌণ বায়ুপ্রবাহ – যেমন: ঘূর্ণবাত (Cyclone), মৌসুমী বায়ু
প্রগৌণ বায়ুপ্রবাহ – যেমন: স্থানীয় বায়ু, ফণ, চিনুক, মিস্ট্রাল
প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রেণীবিভাগ
বায়ুপ্রবাহের প্রকৃতি ও উৎপত্তি অনুযায়ী এটিকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:
নিয়ত বায়ুপ্রবাহ (Planetary wind)
সাময়িক বায়ুপ্রবাহ (Seasonal wind)
আকস্মিক বায়ুপ্রবাহ (Variable wind)
স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ (Local wind)
নিয়ত বায়ুপ্রবাহ
নিয়ত বায়ুপ্রবাহ হলো উচ্চচাপযুক্ত অঞ্চল থেকে নিম্নচাপযুক্ত অঞ্চলের দিকে বছরের সকল সময় প্রবাহিত বায়ু। এটি তিন ভাগে বিভক্ত:
আয়ন বায়ু (Trade wind)
অবস্থান: 5° থেকে 30° অক্ষাংশ, কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপে
বৈশিষ্ট্য: উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত
ব্যবহার: প্রাচীন মালবাহী বাণিজ্য জাহাজ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয়, তাই একে বাণিজ্য বায়ু বলা হয়
পশ্চিমা বায়ু (Westerly wind)
অবস্থান: 30° থেকে 60° অক্ষাংশ, কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ থেকে মেরু নিম্নচাপে
বৈশিষ্ট্য: ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী পশ্চিমে বেঁকে প্রবাহিত
মেরু বায়ু (Polar wind)
অবস্থান: 60° থেকে 90° অক্ষাংশ, মেরু উচ্চচাপ থেকে মেরু নিম্নচাপে
বৈশিষ্ট্য: শীতল ও শুষ্ক, মেরু অঞ্চলে তুষারপাত ও ঝড়ের কারণ
সাময়িক বায়ুপ্রবাহ
সাময়িক বায়ুপ্রবাহ ঘটে দিন বা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে, স্থল ও জলভাগের তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে।
স্থল বায়ু
রাত্রি বেলায় স্থল দ্রুত শীতল হয়, সমুদ্র তুলনামূলকভাবে উষ্ণ থাকে
বায়ু স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়
সমুদ্র বায়ু
দিনের বেলায় স্থলভাগ সমুদ্রের তুলনায় বেশি উত্তপ্ত হয়
বায়ু সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়
মৌসুমী বায়ু
শীত ও গ্রীষ্মে স্থল ও জলভাগের তাপমাত্রার তারতম্য জনিত চাপের পার্থক্য সৃষ্টি করে
ভারতে মৌসুমী বায়ুর প্রভাব বেশি, যা ভারতকে মৌসুমী জলবায়ুর দেশ হিসেবে পরিচিত
আকস্মিক বায়ুপ্রবাহ
ভূপৃষ্ঠের স্বল্প পরিসরে হঠাৎ চাপের তারতম্যের কারণে যে প্রবল বায়ু প্রবাহ হয়, তাকে আকস্মিক বায়ুপ্রবাহ বলা হয়।
ঘূর্ণবাত (Cyclone)
নিম্নচাপ জনিত
উদাহরণ: ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাত
প্রতীপ ঘূর্ণবাত
উচ্চচাপ জনিত
উদাহরণ: মেরু বায়ু
স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ
বছরের নির্দিষ্ট সময়ে চাপ ও তাপের বৈষম্যের কারণে যে বিশেষ বায়ু প্রবাহ দেখা যায়, তাকে স্থানীয় বায়ু বলা হয়।
শীতল স্থানীয় বায়ু
উদাহরণ: মিস্ট্রাল, বোরা
উষ্ণ স্থানীয় বায়ু
উদাহরণ: ফণ, চিনুক, সিরক্কো, লু, খামসিন
উপসংহার
বায়ুপ্রবাহ পৃথিবীর জলবায়ু ও পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়ত, সাময়িক, আকস্মিক এবং স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ জলবায়ুর নিয়ন্ত্রণ, মৌসুমী পরিবর্তন এবং স্থানীয় আবহাওয়া স্থির করার জন্য অপরিহার্য। এই বায়ুপ্রবাহের জ্ঞান কৃষি, জলবায়ু বিজ্ঞান এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

No comments: